রজনী (উপন্যাস) পর্ব- ৩

ক্যাটাগরি: ক্যাটাগরি বিহীন | তারিখ: 26/12/18 | No Comment

( আমার লেখা প্রথম ও শেষ উপন্যাস । এই উপন্যাসটি একটি সত্যি ঘটনার উপরে ১৯৯৮ সালের প্রেক্ষাপটে লেখা । এই উপন্যাসে কোনো শিক্ষণীয় কিছু নাই , জাস্ট একটি সত্যি প্রেমের কাহিনীকে উপন্যাসের মত করে পর্ব পর্ব করে আপনাদের সাথে উপস্থাপন করবো । খুব হালকা ও সাহিত্যমানহীন এই লেখা পড়ে সময় নষ্ট করার আগে আরেকবার চিন্তা করুন , আপনি কি এই লেখা পড়ে সময় নষ্ট করবেন ?
.
আজ থেকে ২০ বছর আগে এই উপন্যাসটি লিখেছিলাম ।
.
আজ পড়ুন ৩য় পর্ব !

অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না । ধারাবাহিক ভাবে পর্ব পর্ব আকারে এই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে । পাত্রপাত্রীর নাম , স্থান কাল্পনিক। )

.

রজনী

মোঃ ফাইজুল হক

.

হাবিবার জিদ চেপে গেছে ।  লাল শাড়ী পড়ে সে কলেজে যাবে । যে ছেলেটি হাবিবাকে চিঠি দিয়েছে সে ছেলেটিকে হাবিবা চিনেনা । ভালবাসার তো প্রশ্নই আসেনা । তাঁর পরও সে লাল শাড়ী পড়ে যাবে । বাবার সাথে জিদ করে যাবে । জিদের কারন একটাই তা হল চিঠি পেয়ে বাবা কেন হাবিবাকে চিঠির কথা জানায়নি । তাঁর মানে বাবা তাঁকে অবশ্যই সন্দেহের চোখে দেখে । বাবা যখন সন্দেহই করেছেন তখন হাবিবা লাল সাড়ি পড়েই যাবে । এবং এর একটা শেষ দেখবে ।

ব্যাপারটা এরকম হওয়ার কথা ছিলনা । মোস্তফা সাহেব দারোয়ান কে দিয়ে হাবিবার কাছে চিঠি পাঠানোর ব্যাবস্থা করেছেন । বাবার ফাদে যেন মেয়ে পা না দেয় সে জন্য জাহানারা বেগম হাবিবাকে সতর্ক করতে চাইলেন । সতর্ক করাও হল এদিকে চিঠিও এসে পৌছল । হাবিবার মেজাজ বিগরে গেল ।

সেই থেকে এই মহা সমস্যার উদ্ভব ।

জাহানারা বেগম অন্ধকার দেখতে লাগলেন । মেয়ে যে উলটো হয়ে যাবে তা তিনি ঘুনাক্ষরেও ভাবেননি । জাহানারা বেগম মনে মনে ইন্নালিল্লাহ পড়তে লাগলেন । মোস্তফা সাহেব কে তিনি ভাল করেই চিনেন । আজ এ বাড়িতে যে একটা রক্তারক্তি ব্যাপার ঘটবে এটা তিনি নিশ্চিত । মেয়ের সাহসের কথা ভাবতে তাঁর গায়ে কাটা দিয়ে উঠে । এরকম একটা দুঃসাহসী মেয়ে তিনি পেটে ধরেছেন তা ভাবতেও কষ্ট হয় । সাহসী হবেনা কেন, যেমন বাপ তেমন মেয়ে । বাপের যেমন দুঃসাহস রয়েছে মেয়ে তো তার অংশ পাবেই । এতে অবাক হবার কিছু নেই ।মেয়ের দুঃসাহস দেখে জাহানারা বেগম সকালে কিছু খেতে পারলেননা । আজ তাঁর কোন  ক্ষিধে নেই ।

মোস্তফা সাহেব সকাল আট টায় অফিসে চলে গেছেন । ফিরবেন বিকেল পাঁচটায় । পাঁচটার পরে এ বাড়িতে কি নাটক হবে তা আল্লাহই ভাল জানেন।

হাবিবা সত্যি সত্যি লাল শাড়ী পড়েছে । সুন্দর করে সাজগোজ করেছে । রূপ চর্চার যত উপকরন ছিল তাঁর কিছুই বাদ দেয়া হয়নী । এমনিতেই হাবিবার চেহারা সুন্দর । টানা টানা ডাগর ডাগর চোখ । তাঁর উপরে ব্যবহার করা হয়েছে আইলাইনার্‌ আইশ্যাডো, মাস্কারা, লিপ লাইনার , কফি কালারের লিপস্টিক যাবতীয় উপকরণ । করা মেকাপ , লাল শাড়ী আর কড়া প্রসাধনে তাঁকে অপূর্ব লাগছে ।  যে কোন নিরস পুরুষের মনে ধাক্কা লাগার জন্য যথেষ্ট । আয়নায় নিজের চেহারা দেখে হাবিবার ভীষণ ভাল লাগছে । নিজেই নিজের প্রেমে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে ।

হাবিবা কলেজে চলছে । সে জানেনা কে তাঁকে চিঠি লিখেছে । কলেজে যাবার সময় কতজনই তো তাকিয়ে থাকে । দুই একজন আবার তাকিয়ে থাকে হা করে । মুখের মধ্যে একশ মাছি ঢুকে গেলেও টের পাবেনা ।

হাবিবা যাচ্ছে  আর মনে মনে ভাবছে  পুরুষ জাতটাই কুকুর । কুকুর যেমন মরা গরুর দিকে রাক্ষুসে চোখে তাকায় , মেয়েদের দেখলে পুরুষরাও সে রকম করে তাকিয়ে থাকে । বেহুঁশ হয়ে যায় । গাড়ী চাপা পড়েনা কেন কে জানে । হাবিবা ঠিক করেছে যেই হোক তাঁকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিতে হবে । শালা মেয়েদের দেখলেই চিঠি দিতে হবে । যতোসব বজ্জাত । খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে প্রেম প্রেম খেলা । সব শালাদের পাগলা গারদে ভরে রাখা উচিৎ । বলা নেই কওয়া নেই লাল শাড়ি পড়ে আসতে হবে, উনি মহা মজনু হয়ে বসে আছেন । আজকে মজনু সাহেব কে একটা উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে । লাইলি মজনুর কি যেন একটা গান আছে । মনে আসছে হ্যা – লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আখি খোল …… । গান গেয়ে গেয়ে শালা মজনুর পাছায় দুটো লাথি মারতে পারলে ভাল হত । মেয়েদের সায়া ব্লাউজ পরিয়ে মজনু মিয়ার দ্বারা ড্যান্স দেয়াতে পারলে আরও ভাল হত । ড্যান্সের সাথে সাথে মুখে থাকতো গান – বন্ধুর মাথায় কোকড়া কোকড়া চুল …… ।

মজনুকে খুজতে হাবিবা কে বেশি দূর যেতে হলনা । বাড়ির সামনের রাস্তায় মজনুদের দেখা পাওয়া গেল । মজনু সাহেব একা নন । সাথে সঙ্গি আছে এক জন । দুই জনই ইয়াং । হ্যান্ডসাম ফিগার । মজনু সাহেব পড়েছেন পাজামা পাঞ্জাবি । নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি । পাঞ্জাবির গলায় কোন বোতাম নেই । গলার কাছে সুন্দর কারুকাজ করা । সাদার উপরে সাদার কারুকাজ করা । প্রায় বরের কাছাকাছি সাজ । বর হতে একটু বাকি । বরের মাথায় বিয়ের টোপর থাকে , ইনার মাথায় টোপর নেই । হাতে দুটি লাল গোলাপ ।

অন্যজন সাধারন পোশাকে । কফি কালারের প্যান্ট আর নীল রঙের শার্ট । শার্ট ইন করা । পায়ে চকলেট কালারের বুট । নায়কের সাথে সহ নায়কের মত লাগছে । হাবিবাকে লাল শাড়িতে দেখে ছেলে দুটো মিট্মিট করছে । কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে । অসস্থি কাটাবার জন্য জামা কাপড় টেনে ঠিকঠাক করছেন । পাজামা পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটি দারুণ অসস্থিতে পরে গেছে । নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে । চোখতুলে তাকাচ্ছে আবার চোখ নিচু করছে । খুক খুক করে কাশি দিচ্ছে । শরীরের মধ্যে হাল্কা কাপন শুরু হয়েছে ।

শার্ট পরা ছেলেটি অর্থাৎ সাইড নায়ক এগিয়ে এসে হাবিবাকে লক্ষ করে বলল , ওয়ান্ডারফুল ওয়ান্ডারফুল , ইউ আর ওয়েলকাম , আমরা জানতাম আপনি অনুরোধ রাখবেন । পাজামা পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটিকে বলল হাবার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? ভাবিকে কংগ্রেচুলেশন জানা । পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটি কিছু বলতে পারছেনা । থতমত করে কি যেন বলতে চাইল । কথা স্পষ্ট হলনা । অন্যসব মেয়েদের মত হাবিবা ঘাবড়ে যায়নি । সাহস করে আরও সামনে এসে পাঞ্জাবি পরা ছেলেটিকে লক্ষ্য করে বলল , “ আপনি আমাকে চিঠি লিখেছেন “? পাঞ্জাবি পরা হ্যা না কিছু বলতে পারছেনা । শার্ট পরিহিত ছেলেটি বলল , হ্যা ; ওই লিখেছে । আপনি বুঝতে পারেন যে ও লিখেছে ?

আগে বুঝতে পারিনি, কাছে এসে বুঝছি । তা আপনি আমার কাছে কি চান ? শার্ট পরিহিত ছেলেটি উত্তর দিলো , আপনি বুঝি তা বোঝেন না ? সব কথা কি আর মুখে বলা যায় । কিছু কিছু কথা বুঝে নিতে হয় । এই যেমন আপনি বুঝেছেন । ও যে কি চায় তা আপনি না বুঝলে লাল শাড়ি পরে আসতেন না । ওর চাওয়া বুঝছেন বলেই তো লাল শাড়ি পরে এসেছেন ।

ঃ আমি কারো কোথায় লাল শাড়ি পরে আসিনি । কখন নীল শাড়ি পড়বো কখন লাল শাড়ি পড়বো সেটা একান্তই আমার নিজের ব্যাপার ।

ঃ তাহলে আপনি ওর প্রস্তাবে সম্মত নন ?

ঃ সম্মত নাকি অসম্মত তা পরে দেখব । আগে আমার কথার উত্তর দিন ।

ঃ কি কথা ?

ঃ চিঠি লিখেছেন কেন ?

ঃ ভালবাসে, সে জন্য চিঠি লিখেছে ।

ঃ যে কথা চিঠিতে লিখেছেন সেকথা মুখে বলতে পারছেন না কেন ?

ঃ মুখে বলতে একটু লজ্জা লাগেনা ? প্রথম দিকে তো একটু লজ্জা থাকবেই ।

ঃ উনি কি করেন ?

ঃ পড়াশোনা করে । এই মানে পড়াশোনা শেষ করেছে । ইকোনমিক্স এ মাস্টার্স সেকেন্ড ক্লাস , চাকরি খুজছে । পাঁচ জায়গায় ইন্টার ভিউ দিয়েছে । এর মধ্যে দু জায়গায় চাকুরি কনফার্ম । ও কোন সমস্যা হবেনা ।

ঃ সমস্যা হবেনা মানে একশ বার সমস্যা হবে । উনার চাকুরী হবেনা ।

ঃ কেন ?

ঃ একটা মেয়ের সামনেই মুখ থেকে কথা বেরয়  না ,ইন্টার ভিউ বোর্ড এ তো বোমা মারলেও কথা বেরবে না ।

পাঞ্জাবি পরিহিত ছেলেটি লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে । তার ধারনা ছিল হাবিবা হয়তো আজ কলেজে যাবেনা, লাল শাড়ি পড়বেনা , যদি লাল শাড়ি পড়েই তাহলে হাতে থাকবে একটা নীল খাম । যার মধ্যে থাকবে গোটা গোটা হরফে লেখা একটা ছোট চিঠি । লেখা থাকবে তুমি রোমিও হয়ে থেক আমি জুলিয়েট হয়ে বসে আছি । এই রকম একটা কিছু । কোন রকমে হাতে চিঠিটা ধরিয়ে মুখ নিচু করে চলে যাবে । প্রেমের প্রথম তো লজ্জা লজ্জা লাগবেই । সব ধারনা ভুল । এই মেয়ে ভয়ংকর মেয়ে । উকিলের মত তর্ক শুরু করে দিয়েছে ।

হাবিবা কথা বলে যাচ্ছে , শোনেন , দেখে তো মনে হয় লজ্জাবতীর মত লাজুক । এত লজ্জা নিয়ে ভালবাসার চিঠি লিখলেন কেমন করে ? তখন লজ্জা লাগেনি ? কথা বলছেন না কেন ? বলেন আপনি কি আমায় ভালবাসেন ?

হ্যা , পাঞ্জাবি ওয়ালা মুখ খুলল ।

ঃ ভালবাসার ফলাফল টা কি হবে ?

ঃ ভালবাসলে যা হয় তাই হবে ।

ঃ ভালবাসার ফলাফল তো কত রকমের হয় । সুইসাইড করা হয় , ওয়াদা খেলাফ করা হয় , এসিড মারা হয় , বিয়ে করা হয় । আপনার বেলায় কোনটা হবে ?

পাঞ্জাবি ওয়ালা কোন জবাব খুজে পাচ্ছেনা । আমতা আমতা করছে । হাবিবা আবার প্রশ্ন করল , ভালবেসে আপনি কি আমায় বিয়ে করবেন ? মানে বিয়ে করতে চান ? উত্তর দিচ্ছে না কেন ? বলেন বিয়ে করতে চান ?

ঃ হ্যা ।

ঃ কখন করবেন ?

ঃ সময় হলে ।

ঃ সময় টময় না , এখন বিয়ে করতে পারবেন ?

ঃ এখন মানে ?

ঃ এখন মানে এখন । আজকে এই মুহূর্তে ।

ঃ এই মুহূর্তে ?

ঃ হ্যা, এই মুহূর্তে । শুভ কাজে বিলম্ব করতে নেই । শুভশ্য শিঘ্রম । কি সাহস হয় ?

ঃ হ্যা  ।

ঃ এখন তো হ্যা হ্যা করছেন , পরে আবার বিয়ে ছেড়ে পালিয়ে আসবেন না তো ?

ঃ না ।

ঃ বুকে সাহস রাখতে হবে । প্রয়োজনে মুখে কথার খই ফুটাতে হবে । নাকি তখন আবার মিনমিন করবেন ?

ঃ মিনমিন করব না ।

ঃ সাহস থাকলে এক কাজ করেন আমার সাথে আসেন ।

ঃ কোথায় ?

ঃ আমাদের বাড়িতে । আমাদের বাড়িতে যেতে সাহস লাগেনা ? ভয় হয় ?

ঃ না ।

ঃ তাহলে আসুন । দেখেন ভাগ্য কোন দিকে যায় । আপনার নাম টা তো জানা হলনা ।

ঃ আমার নাম রিয়াজ আহমেদ ।

ঃ উনি কি আপনার বন্ধু ?

ঃ হ্যা , ওর নাম মেহেদী কবির ।

ঃ আসেন । যখন আমি যেতে বলব তখন যাবেন । তার আগে এ বাড়িতে বসে থাকবেন । আমার কথা ছাড়া এ আগে চলে যাবেন না । তাহলে বিপদে পড়বেন । তারা তিনজন হেটে চলেছে । সামনে হাবিবা । রিয়াজ   আহমেদের হাতে এখনো দুটি লাল গোলাপ । গোলাপ দুটি এখনো তাজা ।

রিয়াজ আহমেদ এবং মেহেদী কবির বসে আছে হাবিবা দের গেস্ট রুমে । কখনো চেয়ারে হেলান দিয়ে কখনো টেবিলে ঠেস দিয়ে সময় পার করে দিচ্ছে । তারা বসে আছে প্রায় চার ঘন্টা । এখন বেলা দুটা ত্রিশ মিনিট । তাঁদেরকে খাবার দেয়া হয়েছে । চা বিস্কিট দেয়া হয়েছে , ডিপ ফ্রিজ থেকে  আইস্ক্রিম বের করে দেয়া হয়েছে । শুভ ক্ষনে ক্ষনে এসে উকি মেরে দেখে যাচ্ছে । তার খুব মজা হচ্ছে । বাড়িতে একটা ভয়াবহ ব্যাপার ঘটবে এতে সে ভীত নয় বরং আনন্দিত ।

শুভ কিছুক্ষন পর পর একটা গানের মত গাইছে –

আইছেন দুলাভাই খাইছেন কি

মার পরানে কয় কি

মটকিরে কয় আলমারী

ব্যাঙ্গেরে কয় টিপতালা

ফড়িংরে কয় টিপ চাবি

 

আসমা এসে একবার উকি মেরে আড় চোখে দেখে গিয়েছে । হাবিবা দু বার এসেছিল । দু বারই বলে গেছে আমার কথা ছাড়া বাড়ী থেকে নড়বেন না । আরাম করে বসেন , ইচ্ছে হলে শুতেও পাড়েন । টিভি দেখতে পারেন । সেলফে বই আছে , বইও পড়তে পাড়েন ।

রিয়াজ আহমেদ স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন । সামনে কি ব্যাপার ঘটবে এ নিয়ে তার কোন মাথা ব্যাথা নেই । যা ঘটছে এটাই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার । ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেক সময় মানুষের মাথা ভীষণ ঠান্ডা থাকে । যে লোক তেলাপকা দেখলে ভয় পায় দেখা যায় স্টেন গানের সামনে সেই লোকটাই বুক ফুলিয়ে দাড়িয়েছে । মানুষের আচরণ বড় বিচিত্র , ভীষণ জটিল ।মানুষ জটিল বলেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ।

মেহেদী কবির উসখুস করছে । এ বাড়ী এখন তার কাছে জেলখানার চেয়েও খারাপ । পালিয়ে যেতে পারলে ভাল হত । প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে জেল থেকে পালানো যত সহজ বন্ধুদের কাছ থেকে কেটে পড়া তার থেকে কঠিন । মেহেদী কবিরের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত অসহ্য লাগছে। এই বাড়িতে দশ মিনিট বসে থাকার চেয়ে দশ মাস জেলে থাকা অনেকবেশি আরামদায়ক । মেহেদী কবির পালানোর ছল ছুতা খুঁজছে । মোস্তফা সাহেব অফিস থেকে ফেরার আগেই কেটে পড়া ভাল । রিয়াজ আহমেদ কেটে পরবে না । সে তার প্রতিশ্রুতি রাখবে । অর্থাৎ সে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবেনা। রিয়াজ আহমেদের এই সিদ্ধান্তে মেহেদী কবির কে আরও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে । মোস্তফা সাহেব বাড়ী ফেরার পর ছোট খাটো একটা কেয়ামত হয়ে যাবে । রাস্তায় মেয়েদের উত্যাক্ত করার অভিযোগে এনে পুলিশ ডাকা হতে পারে । তার পরের ইতিহাস হবে ঝামেলার ইতিহাস । এই ঝামেলার মধ্যে মেহেদী কবির নিজেকে জড়াতে চায়না ।

মেহেদী কবির এর সামনে একটা সুযোগ এসেছে । সিগারেট শেষ হয়ে গেছে । সিগারেট আনার নাম করে কেটে পড়া যায় । সিগারেট আনার নাম করে মেহেদি কবির বেরিয়ে গেল । রিয়াজ আহমেদ একটা বই নিয়ে পড়া শুরু করে দিয়েছে । বই এর নাম “ আজব দুনিয়ার রহস্য” । মজার মজার সব খবর । গার্ডেন স্মাইল জাতের শামুকের জীভে ১৩৫ সারি দাঁত । তিমি মাছের কলিজার ওজন এক টন । আফ্রিকার তুয়াবেগ গোত্রের পুরুষেরা বোরখা পরে । মানুষের কিডনির ফিল্টার নাড়িগুলোর দৈর্ঘ্য চল্লিশ মাইল। আজব আজব সব খবর । সময় কাটানোর জন্য ভাল একটা বই । বই এর এক যায়গায় লেখা আছে একটা চিঠির বর্ণনা । এই চিঠিটি পোস্ট করার ছেচল্লিশ বছর পর প্রাপকের হাতে পৌঁছে । সানফ্রানসিসকো থেকে জেমস ব্রনি  ভার্জিনিয়ায় পৌঁছাই । এটাই পৃথিবীর সবথেকে ধির গতির চিঠি ।  জেমস ব্রনি যখন চিঠিটি লিখেছিলেন তখন তারা নব দম্পতি । চিঠিটি যখন হাতে পৌঁছায় তখন তারা নিরস বৃদ্ধ । বৃদ্ধ বয়সে যৌবনের স্মৃতি মাখা চিঠি পেয়ে আনন্দে বৃদ্ধ – বৃদ্ধা কেঁদে ফেলেন ।

বই এর পাতার ফাকে হাতে লেখা একটি চিঠি পাওয়া গেল । চিঠির লেখক সলেমান মিয়া নামে একজন লোক । চিঠিটি লেখা হয়ছে মইনুদ্দিন এর কাছে । চার পৃষ্ঠার বিশাল এক চিঠি । দীর্ঘ চিঠি পড়তে স্বাভাবিক ভাবে বিরক্ত লাগে । রিয়াজ আহমেদ দীর্ঘ চিঠি লিখতে পারেনা । চার লাইন লিখতেই মনের সব ভাষা শেষ হয়ে যায় । রিয়াজ আহমেদের বড় ভাই শায়ের আহমেদ কানাডা থাকেন । স্বপরিবারে কানাডায় ইমিগ্রান্ট । রিয়াজ আহমেদের ভাবি মানে শায়ের আহমেদের স্ত্রী রিয়াজ আহমেদ কে সবসময় চিঠি লিখতে বলেন । সব কিছু খুটিয়ে খুটিয়ে বিস্তারিত লিখতে বলেন । রিয়াজ আহমেদ বিস্তারিত লিখতে বসে গেল । বিস্তারিত লিখতে গিয়ে যা লিখল তা হল –

ভাবী

শুভেচ্ছা নিও । আমরা ভাল আছি । তোমরা কেমন আছো ? তিশা , মনি  আর রাদ কে আমার স্নেহ দিও ।                                                                         ইতি

ছোট ভাই

এই পর্যন্ত লিখে রিয়াজ আহমেদের আর কিছু মনে আসছে না । আমরা ভাল আছি তোমরা কেমন আছো এর পর লেখার মত আর কি আছে । সবই তো লেখা হয়ে গেছে । এই চিঠি পেয়ে রিয়াজ আহমেদের ভাবী নাজনিন নাহার যে উত্তর পাঠালেন তা রিতিমত অপমানজনক ।

 

চিঠির সারমর্ম এই রকম

১৬টি শব্দের চিঠি লিখে ৪৮ টাকা ডাক খরচ দিয়েছ । তোমার প্রতিটি শব্দের জন্য খরচ হয়েছে ৩ টাকা ।  তার মানে তোমার প্রতিটি শব্দের মূল্য ৩ টাকা । আমি জানি তোমার হাতে টাকা নেই । তুমি ৫০০ শব্দের চিঠি লিখো । ৫০০ শব্দের জন্য আমি তোমাকে  ১৫০০ টাকা  দেবো । পারিশ্রমিক হিসেবে নয়।  টাকা দেবো কাগজ কলমের খরচ বাবদ । বেশি লিখতে তো বেশি কাগজ খরচ হবে , ঠিক না ?

রিয়াজ আহমেদের সন্মানে আঘাত লাগলো , বিশাল চিঠি লিখতে হবে । ভাবিকে দেখাতে হবে , সেও বিস্তারিত লিখতে জানে । ঘন্টা দুয়েক চেষ্ঠা করে বিশাল একটা  চিঠি লেখা হলো । সেই চিঠিকে চিঠি বলা যায় না । বলা যায় প্যাচাল বর্ননা  । এই চিঠি পড়তে গ্যালে ভীষন  শান্ত স্বভাবের মানুষও অধৈর্য্য হয়ে যাবে । চিঠির কিছু অংশ  এরকম –

 

ভাবী ,

আমার শুভেচ্ছা নিও । তুমিও কেমন আছো ? আমরা ভালো আছি তবে কাজের ছেলেটার পেট খারাপ । পেট খারাপ তো হবেই ওর ভিষন লোভ । গতরাতে দুই বাটি বাসি ডাল খেয়েছে । এখন বার বার বাথরুমে যাচ্ছে । একবার কাপড় নষ্ট করেছে  । দুর্গন্ধে ওর ঘরের আসে পাসে নাক দেওয়া যাচ্ছে না । আমাদের কুকুরটার ৪ টা বাচ্চা হয়েছে , দুইটা কালো দুইটা সাদা বাচ্চা । বাচ্চাগুলা দেখতে নাদুস নুদুস । চুক চুক করে দুধ খায় । ……………………………. ।

.

চলবে …………………………

নিচের বাটনগুলো দ্বারা শেয়ার করুন:

ফেইসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of

ফেসবুকে লাইক দিন

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

MD. Faijul Huq youtube subscribe

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

error: Content is protected !!
Dr. Md. Faijul Huq
Dr. Md. Faijul Huq